শেয়ারদরে ঊর্ধ্বমুখিতা ধরে রাখার চেষ্টায় এশিয়ার প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো

নতুন বছরের প্রথম মাস শেষ হয়ে এল। বৈশ্বিক বাজারে তখন ঝুঁকি নেয়ার প্রবণতা ও সতর্ক ভাবের বিরল সহাবস্থান দেখা যাচ্ছে।

নতুন বছরের প্রথম মাস শেষ হয়ে এল। বৈশ্বিক বাজারে তখন ঝুঁকি নেয়ার প্রবণতা ও সতর্ক ভাবের বিরল সহাবস্থান দেখা যাচ্ছে। শক্তিশালী আয় ও এআই-কেন্দ্রিক বিনিয়োগের আশায় এশিয়ার প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো শেয়ারদরে ঊর্ধ্বমুখিতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে মুদ্রাবাজারে ডলারের দুর্বলতা ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের স্বর্ণ-রুপার মতো মূল্যবান ধাতুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) সুদহার বিষয়ে প্রত্যাশিত বিরতির মধ্যেই করপোরেট কোম্পানিগুলোর আর্থিক ফলাফল, ডলারের গতি-প্রকৃতি ও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা মিলিয়ে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। তবে এর মধ্যেও বাজারে পারফরম্যান্স নিয়ে আশাবাদী কোম্পানিগুলো। খবর রয়টার্স।

এশিয়ার প্রযুক্তি খাতে শেয়ারদরে জানুয়ারিজুড়ে চলা ঊর্ধ্বমুখিতা সামনেও বজায় থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। আর্থিক প্রতিবেদন না করলেও এখনো অ্যাপলের আয় নিয়ে বিনিয়োগকারীরা আশাবাদী। অন্যদিকে মার্কিন ও ইউরোপীয় কর্মকর্তারা পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেয়ার কথা বললেও দুর্বল অবস্থায় রয়েছে ডলার।

মূল্যবান ধাতুর দিকে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকে পড়ায় স্বর্ণ ও রুপার দাম সর্বকালের উচ্চতায় পৌঁছেছে। একই সঙ্গে ইরানের প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভাব্য হামলার হুমকির পর জ্বালানি তেলের দাম চার মাসের সর্বোচ্চে উঠেছে।

ফেডারেল ওপেন মার্কেট কমিটির (এফওএমসি) সর্বশেষ বৈঠকেও সুদহার অপরিবর্তিত রেখেছে ফেড, যা প্রত্যাশিতই ছিল। এর কারণ হিসেবে মার্কিন অর্থনীতির ইতিবাচক ধারার কথা উল্লেখ করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকটির চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল। অবশ্য মে মাসে চেয়ারম্যানের পদ ছাড়ার পর গভর্নর হিসেবে তিনি থাকবেন কিনা কোনো মন্তব্য করেননি। বড় আকারে সুদহার কমাতে এখনো ফেডের ওপর চাপ বাড়াচ্ছেন ট্রাম্প।

ফেডের সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় এপ্রিলের মধ্যে আরেক দফা মার্কিন মুদ্রানীতি শিথিল হবে, এমন সম্ভাবনা কমেছে। মাত্র ২৬ শতাংশ বিনিয়োগকারীরা এ সম্ভাবনার পক্ষে। অন্যদিকে জুনে সুদহার কমতে পারার এ সম্ভাবনা দেখছেন ৬১ শতাংশ।

বিনিয়োগকারীরা আশা করছেন, সুদহার বিষয়ে অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও শেয়ারবাজারে চাহিদা ধরে রাখবে করপোরেট কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন। দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং এরই মধ্যে সে প্রত্যাশা পূরণের ঘোষণা দিয়েছে। এআই সক্ষমতা গড়ে তোলার প্রতিযোগিতায় চিপের দাম বাড়ায় কোম্পানিটির পরিচালন মুনাফা বেড়েছে তিন গুণ।

গতকাল দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ার সূচক বেড়েছে দশমিক ৬ শতাংশ। সব মিলিয়ে জানুয়ারিতে এ সূচক ২৩ শতাংশ সম্প্রসারণ হয়েছে। একই সময় প্রযুক্তিনির্ভর তাইওয়ানের শেয়ারবাজার প্রায় ১৩ শতাংশ ঊর্ধ্বমুখী ছিল।

ইয়েনের বিনিময় হারে বড় ধরনের ওঠানামা ও দেশীয় বন্ড ইল্ডের তীব্র বৃদ্ধির কারণে কিছুটা চাপে থাকলেও জাপানের নিক্কেই সূচক বৃহস্পতিবার বেড়েছে দশমিক ২ শতাংশ। জাপান বাদে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বিস্তৃত শেয়ার সূচক এমএসসিআই মোটামুটি অপরিবর্তিত ছিল।

ইউরোপে ইউরোস্টক্স ৫০ ফিউচার্স ও ডিএএক্স ফিউচার্স দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। এফটিএসই ফিউচার্স বেড়েছে দশমিক ২ শতাংশের বেশি। অন্যদিকে ওয়াল স্ট্রিটে স্থির ছিল এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ফিউচার্স। নাসডাক ফিউচার্স দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। মাইক্রোসফট নিয়ে হতাশার বিপরীতে মেটার শক্তিশালী আর্থিক গতি-প্রকৃতি পরিস্থিতি সামাল দিতে সূচকটিকে সাহায্য করেছে। এর আগে গত বুধবার মার্কিন শেয়ারবাজার প্রায় অপরিবর্তিত অবস্থায় লেনদেন শেষ করে।

তবে আফটার-আওয়ার্স লেনদেনে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ পতন দেখেছে মাইক্রোসফটের শেয়ার। মূলত কোম্পানিটির বিশাল মূলধনি ব্যয় যথেষ্ট রিটার্ন দেবে কিনা, তা নিয়ে সংশয়ে ছিলেন বিনিয়োগকারীরা। অন্যদিকে চলতি বছরের জন্য আয় ও মূলধনি ব্যয় দুটিরই পূর্বাভাস বাড়িয়েছে মেটা। ফলে আফটার-আওয়ার্স লেনদেনে কোম্পানিটির শেয়ারদর ৮ শতাংশ বাড়ায় বাজারমূল্যে প্রায় ১৪ হাজার কোটি ডলার যোগ হয়েছে।

জেপি মরগানের বিশ্লেষকরা বলছে, ‘এখন পর্যন্ত মেটা ও মাইক্রোসফট দুই কোম্পানির ক্ষেত্রেই সাধারণ প্রবণতা হলো প্রত্যাশার তুলনায় বেশি মূলধনি ব্যয়। এটি এআই খাতে বিনিয়োগের ঊর্ধ্বমুখী গতির প্রতিফলন।’

তবে মাইক্রোসফটের সঙ্গে পার্থক্য হলো চলতি বছরের জন্য বাজার প্রত্যাশার তুলনায় আয়ের পূর্বাভাস অনেক বেশি বাড়িয়েছে মেটা।

বর্তমানে বিনিয়োগকারী তাকিয়ে আছেন অ্যাপলের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের দিকে। জেপি মরগান আশা করছে, আইফোন ১৭-এর শক্তিশালী চাহিদা ও ব্যয়ের ধীরগতির কারণে পূর্বাভাস ছাড়িয়ে যাবে কোম্পানিটির আয়। চলতি বছরের পূর্বাভাসে অ্যাপলের শেয়ারদর ৩০৫ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৩১৫ ডলার করেছে ব্যাংকটি।

মুদ্রাবাজারে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অনিশ্চয়তা ও ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণের বোঝার বিপরীতে বিনিয়োগকারীরা সুরক্ষা খুঁজতে থাকায় চাপে রয়েছে ডলার। মুদ্রাটির সমর্থনে মার্কিন কর্মকর্তাদের মন্তব্য বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করতে পারেনি। ইউরোপীয় নেতারাও ডলারের পতন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের (ইসিবি) কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইউরোর আরো অবমূল্যায়ন হলে সুদহার কমানোর প্রয়োজন হতে পারে।

ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদ জ্যাক অ্যালেন-রেনল্ডস বলেন, ‘ডলারের আরো অবমূল্যায়ন ইসিবিসহ অন্যান্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদহার কমানোর সম্ভাবনা বাড়াবে। একই সঙ্গে উদীয়মান বাজারগুলো গত বছরের মতো ভালো পারফরম্যান্স করতে পারে।’

আরও